
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত গণভোটের রায় নিয়ে বিএনপি দ্বিমুখী আচরণ করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক মিয়াজ মেহরাব তালুকদার। গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গণভোট পরবর্তী জটিলতা নিয়ে দলটির তীব্র সমালোচনা করেন।
মিয়াজ মেহরাব তার পোস্টে উল্লেখ করেন, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোটের সিদ্ধান্ত জনগণকে প্রতিনিধি বাছাই এবং রাষ্ট্রের কাঠামো নির্ধারণ—উভয় ক্ষমতা দিয়েছিল। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপি নির্বাচনে ৫০ শতাংশের কম ভোট পেলেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ, কোনো রাজনৈতিক দলের চেয়েও জনগণের আস্থা গণভোটের বা জুলাই সনদের পক্ষে বেশি।
মিয়াজ মেহরাব তালুকদারের ফেসবুক পোস্টটি হুবহু নিচে দেওয়া হলো:
“একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোট—এই যুগপৎ সিদ্ধান্ত মানুষকে একসাথে দুইটা ক্ষমতা দিয়েছিল: প্রতিনিধি বাছাই করার ক্ষমতা, আর রাষ্ট্রের কাঠামো নির্ধারণের ক্ষমতা। জনগণ সেই দুই ক্ষমতাই ব্যবহার করেছে স্পষ্টভাবে। নির্বাচনে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—৫০ শতাংশের কম ভোটে। আর গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলেছে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ। সংখ্যাটা রিমার্কেবল। জনগণের আস্থা গণভোটের পক্ষে, কোনো দলের চেয়েও বেশি।
এই বাস্তবতার পরও যদি গণভোট বাস্তবায়ন নিয়ে টালবাহানা শুরু হয়, যদি বলা হয় “এটা সাংবিধানিক নয়”, “আইনি ভিত্তি নেই”—তাহলে প্রশ্নটা আর আইনি থাকে না, হয়ে যায় নৈতিক ও রাজনৈতিক। কারণ এই গণভোট কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত না। একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন ছিল বিএনপিরই দাবি। জুলাই সনদে তারা সই করেছে, নোট অব ডিসেন্ট রেখেছে, পুরো প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিয়েছে। এই গণভোটের প্রতিশ্রুতি দেখিয়েই তারা মানুষের ভোট নিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর দৃশ্যপট বদলে গেছে। এখন গণভোট বাস্তবায়নে অনীহা, দ্বিধা, এমনকি অস্বীকৃতি—সব মিলিয়ে
জনগণের সরাসরি রায়কে ক্ষমতার কাঠামোয় রূপ দিতে তারা রাজি না।
গণভোট বাস্তবায়ন না করা মানে ৭ কোটির বেশি মানুষের রায় কার্যত বাতিল করা। জনগণের রাজনৈতিক অবস্থানকে অস্বীকার করা। আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়—গণভোটকে ‘বেআইনি’ বলার একটা চেষ্টা কিছু নেতার মধ্যে দেখা যাচ্ছে (মেজর হাফিজের বক্তব্য)। এতে শুধু গণভোট নয়, যে নির্বাচন থেকে এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তার বৈধতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। ক্ষমতার নেশায় ডুবে থাকা রাজনীতিতে এই আত্মঘাতী পরিণতির হিসাব রাখা হয় না।
ইতিহাস এখানে অস্বস্তিকরভাবে পরিচিত। ১৯৯৬ সালে একতরফা নির্বাচন, ২০০৬ সালে নির্বাচন রিগ করার চেষ্টা—ক্ষমতায় যেতে গণতন্ত্রকে ব্যবহার করা, আর ক্ষমতায় গিয়ে তাকে পাশ কাটানো—এই প্যাটার্ন নতুন না। ২০২৬ সালের পর গণভোট নিয়ে অবস্থান বদল সেই পুরোনো ট্র্যাকেরই ধারাবাহিকতা। আগে পক্ষে থাকা, ভোট নেওয়া, জিতে গিয়ে ৩৬০ ডিগ্রি ইউ-টার্ন নেওয়া—এটা জনতার সাথে সরাসরি প্রতারণা। পলিটিকাল স্ক্যাম।
এর পরিণতি হালকা হবে না। গণভোট অবজ্ঞা করলে গণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষুব্ধ হবে, রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়বে, মানুষের আস্থা ভাঙবে।
মানুষ যদি দেখে সরাসরি দেওয়া রায়ও শেষ পর্যন্ত অগ্রাহ্য হয়, তাহলে ভোট, নির্বাচন, গণভোট—সবকিছুর অর্থই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। গণতন্ত্র কোনো দলের সম্পত্তি না। যারা ক্ষমতায় গিয়ে জনরায় অস্বীকার করে, ইতিহাস তাদের ক্ষমা করে না।
আজ যে পথে বিএনপি হাঁটছে, তা গণতন্ত্রের পথ না—তা ক্ষমতা রক্ষার পুরনো পথ। এই পথ অব্যাহত থাকলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার বদলে দেশ আবারও অস্থিরতার দিকেই যাবে। এটা আশঙ্কা না, এটা প্রায় নিশ্চিত বাস্তবতা।”
এনসিপি নেতার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গণভোটকে ‘বেআইনি’ বলার চেষ্টার ফলে বর্তমান সরকারের বৈধতা সংকটে পড়তে পারে বলে তিনি যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা বিশ্লেষণ চলছে।
Somajer Alo24