ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্টেনোগ্রাফার সুলতান উদ্দিনের ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর জেলাজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে এবং নিজের অপরাধ আড়াল করতে অভিযুক্ত কর্মচারী ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ও কার্যালয়ের ক্যাশিয়ারের ওপর দোষ চাপানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ঘটনার সাক্ষী হতে যাওয়া স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের লাইসেন্স বাতিলের ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে, যার ফলে ভুক্তভোগী মালিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ময়মনসিংহ জেলায় প্রায় ১ হাজার ২০০টি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই লাইসেন্স নবায়ন বা নতুন লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার নামে দীর্ঘ তিন বছর ধরে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিলেন স্টেনোগ্রাফার সুলতান উদ্দিন। মাসের পর মাস ঘুরেও লাইসেন্স না পেয়ে এবং প্রতিনিয়ত 'মাসোহারা' দিতে বাধ্য হয়ে ক্ষুব্ধ ক্লিনিক মালিকরা তার ঘুষ নেওয়ার একটি ভিডিও গোপনে ধারণ করেন এবং পরবর্তীতে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে দেন।
সাপ্তাহিক আবির পত্রিকার সম্পাদক ইউসুফ খান লিটন প্রথম এই ভিডিওটি প্রকাশ্যে আনেন। এর আগেও এই কার্যালয়ের অনিয়ম নিয়ে তার ধারাবাহিক প্রতিবেদনের জেরে সাবেক অফিস সহকারী জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ১ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মামলা হয় এবং তাকে নেত্রকোনার খালিয়াজুড়িতে বদলি করা হয়।
এদিকে, সদ্য যোগদানকৃত ক্যাশিয়ার মেহেদী হাসান জানান, অতীতে তাকেও মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বদলি করা ও মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল। পরবর্তীতে আদালত থেকে সসম্মানে খালাস পেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) নির্দেশে তিনি পুনরায় ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন কার্যালয়ে যোগদান করেন। মেহেদীর অভিযোগ, "ডিজি স্যারের নির্দেশে যোগদানপত্র জমা দিতে গেলে স্টেনোগ্রাফার সুলতান উদ্দিন আমার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় তৎকালীন সিভিল সার্জন স্যারের দোহাই দিয়ে আমার যোগদানপত্র আটকে রাখা হয়। বর্তমান সিভিল সার্জন একজন সৎ মানুষ। আমি কেবল চেক বইয়ের দায়িত্ব পালন করেছি, অন্য কোনো অনিয়মের সাথে আমার সম্পৃক্ততা নেই।"
অন্যদিকে, ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও, অভিযুক্ত সুলতান উদ্দিনকে বাঁচাতে বিভাগীয় প্রশাসন তৎপর বলে গুঞ্জন উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ক্লিনিক মালিক জানান, তারা চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। সুলতান উদ্দিন তাদের হুমকি দিয়ে বলছেন, তদন্ত কমিটির কাছে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়া হবে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে সুর বদলাচ্ছেন। তবে নিরপেক্ষ ফরেনসিক তদন্ত হলে ঘুষের সত্যতা এবং নথিপত্রে মালিকদের স্বাক্ষরের সত্যতা বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এক স্টেনোগ্রাফারকে একই ধরনের অপরাধে তাৎক্ষণিক বদলি, পরবর্তীতে বরখাস্ত ও বিভাগীয় তদন্তের মুখোমুখি করা হলেও ময়মনসিংহের চিত্র ভিন্ন। সুলতান উদ্দিনকে রক্ষায় বিশাল অঙ্কের টাকার লেনদেন ও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন বলেন, "আমি তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর ব্যক্তিগতভাবে পরিচালক স্যারকে বিষয়টি অবহিত করেছি এবং বিগত সিভিল সার্জন স্যারদেরও চিঠি দিয়েছি। এখন পরিচালক স্যার কোনো ব্যবস্থা না নিলে আমি কী করতে পারি? সুলতান উদ্দিনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার কোনো এখতিয়ার আমার নেই।"
তবে অভিযুক্ত কর্মচারীকে বাঁচানোর চেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করে ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. প্রদীপ কুমার বলেন, "আমি তদন্ত রিপোর্টসহ অন্যান্য অভিযোগের নথিপত্র পেয়েছি। খুব দ্রুতই এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
Shohidul Islam
SOMAJER ALO24