
উজানের পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণের প্রভাবে তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্তরাঞ্চলের তিস্তাপাড়ে বন্যা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে নদী তীরবর্তী চর ও নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে এবং কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, ডালিয়া পয়েন্টে সকাল ৬টায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরে সকাল ৯টায় তা ১০ সেন্টিমিটার নিচে নেমে এলেও দুপুরে আবার বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচে প্রবাহিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের সবকটি জলকপাট খোলা রাখা হয়েছে।
পানি বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে তিস্তা অববাহিকার চর ও নিম্নাঞ্চলে। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী ও গয়াবাড়ী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে জলঢাকার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী ও শৌলমারী ইউনিয়নের বাসিন্দারাও সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
এদিকে লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার তিস্তা চরাঞ্চলেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব জানিয়েছেন, নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় চার জেলার অন্তত ৬ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
নদীর পানি বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন কৃষকরা। চরাঞ্চলের বাদামক্ষেত, ধানের বীজতলা ও মিষ্টিকুমড়ার আবাদি জমি পানির নিচে চলে যেতে শুরু করেছে। কালীগঞ্জ উপজেলার কাশীরাম এলাকার বাদামচাষি লাকু মিয়া বলেন, “লিজ নিয়ে চিনাবাদামের আবাদ করেছি। কয়েকদিন ধরে জমিতে পানি জমে থাকায় গাছে পচন ধরছে, ফলন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।”
হাতীবান্ধার গড্ডিমারী এলাকার কৃষক আনোয়ারুল হক জানান, টানা বৃষ্টিতে পানি আরও বাড়লে ধানের চারা, বাদাম ও সবজি চাষে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
ডিমলার ঝাড়সিংহেশ্বর চরের বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, “সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে নদীর পানি বাড়তে থাকে। রাতেই অনেক নিচু এলাকায় পানি ঢুকে পড়ে। পানি আরও বাড়লে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে।”
একই এলাকার আনারুল ইসলাম জানান, গত কয়েকদিন ধরে পানি ওঠানামা করায় চরাঞ্চলের ফসলি জমি বারবার পানির নিচে চলে যাচ্ছে, যা কৃষকদের জন্য নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মহিপুর তিস্তা চরের কৃষক মকবুল হোসেন বলেন, “পাহাড়ি ঢলের পানি আসতে শুরু করেছে। বাড়ির চারপাশে পানি জমছে। পরিবার ও গবাদিপশু নিয়ে উৎকণ্ঠায় আছি।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, “বর্তমানে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উজানের ঢল ও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পানি আরও বাড়তে পারে।”
পরিস্থিতি মোকাবিলায় নদীতীরবর্তী এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি পানিবন্দি পরিবারের তালিকা প্রস্তুত এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েকদিন তিস্তা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। ফলে নদীপাড়ের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
Shohidul Islam
SOMAJER ALO24