
সংঘবদ্ধ দালালচক্রে দয়ায় যেন চলছে চট্টগ্রাম (বিআরটিএ) কার্যালয়ে। দালালচক্রের নিরসনে শত চেষ্টার পরও ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি চক্র।
ডিজিটাল সেবার ঘোষণা, অন্যদিকে গ্রাহক হয়রানির অমানবিক চিত্র–এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, প্রতিষ্ঠানটি আজও দুর্নীতিতে জর্জরিত। এই অব্যবস্থাপনার কেন্দ্রে রয়েছেন আলোচিত দালাল– বাবু কান্তি দাশ।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩ সালের ২৩ মে বিআরটিএ কেন্দ্রীয় কার্যালয় একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঘোষণা দেয়, ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ফি পরিশোধ করলেই সেবা পাওয়া যাবে। এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল ঘুষ ও দালাল নির্ভরতা বন্ধ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। টাকা জমা দিয়ে গ্রাহক ফাইল জমা দিলেও সেই ফাইল দিনের পর দিন পড়ে থাকে। যদি ‘সেটেল’ না হয়–অর্থাৎ দালাল সিন্ডিকেটের অনুমোদন না থাকে–তবে কোনো ফাইলই কার্যকর হয় না। অথচ দালালের হাত ঘুরে আসা ফাইল মুহূর্তেই নিষ্পত্তি পায়।
দালাল চক্রের প্রধান বাবু কান্তি দাশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিআরটিএ কার্যালয়ের ফাইল চলাচল। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ‘মার্কা’ নামক এক ধরনের গোপন সংকেত ব্যবহার করেন, যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেয়–এই ফাইলটি দালালচক্রের ‘স্পেশাল কেস’। বাবু কান্তি দাশের ‘মার্কা’ সংবলিত ফাইল অগ্রাধিকার পায়, দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।
অন্যদিকে, সাধারণ গ্রাহক দিনের পর দিন ঘুরেও সেবা পান না। জানা গেছে, বাবু দাশ এই দালালি থেকে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার গ্রামের বাড়িতে নির্মাণ করেছেন এক নান্দনিক বাড়ি এবং নগরীর দিদার মার্কেট এলাকার ঈশ্বরদী লাইনে কিনেছেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।
বাবু দাশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী ও আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহর লাল হাজারীর অনুসারী। এই দু’জনের দাপট দেখিয়ে আওয়ামী সরকারের আমলে বিআরটিএ’র দালালি করে কোটি কোটি টাকা ইনকাম করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে জহর লাল হাজারীকে অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন বাবু দাশ। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর চট্টগ্রাম বিআরটিএ তে আবারও দালালি কাজে সক্রিয় হয়েছে বাবু দাশের এই চক্র।
এই প্রসঙ্গে বাবু কান্তি দাশ বলেন, ‘আমি কোনো দালাল নই। আমি শ্রমিক নেতা। আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নই। আপনি হয়তো ভুল জায়গায় ফোন দিয়েছেন। আমার বাড়িও সাতকানিয়ায় নয়, রাঙ্গুনিয়া উপজেলায়।’
অথচ বাবু কান্তি দাশের ফেসবুক প্রোফাইল ঘেঁটে এবং অনুসন্ধান করে জানা যায়, তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার ১২ নম্বর ধর্মপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নন্দী পাড়া গ্রামে। তিনি হারাধন দাশের পুত্র। তার প্রোফাইলে এখনও বিভিন্ন আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে ছবি এবং বিভিন্ন পোস্টার রয়েছে। বিষয়টি সময়ের কণ্ঠস্বরকে নিশ্চিত করেছেন ধর্মপুর ইউনিয়নের দায়িত্বরত গ্রাম পুলিশ স্বপন নন্দী। তিনি বলেন, ‘বাবু দাদা আমাদের ইউনিয়নে সমাজসেবক হিসেবে পরিচিত। তিনি আওয়ামী লীগ করতেন, হাসিনার পতনের পর এখন আর গ্রামে আসেন না। তিনি আমাদের সামাজিক যেকোনো অনুষ্ঠানে প্রচুর টাকাপয়সা ব্যয় করতেন। উনি আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়ার রাজনীতি করতেন।’
বাবু দাসের কারণে বিভিন্ন সেবা নিতে এসে সাধারণ গ্রাহকরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সরাসরি সেবা নিতে গেলে ফাইল মাসের পর মাস পড়ে থাকে। অথচ বাবু দাশের মাধ্যমে সেই কাজ ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন হয়।
গ্রাহকদের অনেকেই বলছেন, ‘ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে কাজ হয় না, দালালের টাকা না দিলে অফিস ফাইলই গ্রহণ করে না।’ এই অবস্থায় আইনি কোনো পদক্ষেপ না থাকায় বাবু দাসের চক্রটি আরও দুর্বিনীত হয়ে উঠছে।
এই প্রসঙ্গে বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মো. মাসুদ আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো মন্তব্য পায়নি।
Somajer Alo24