শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ১১:৩০ অপরাহ্ন

৫ ডিসেম্বর ঝিনাইগাতী মুক্ত দিবস

মোহাম্মদ দুদু মল্লিক, শেরপুর:
  • Update Time : সোমবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২৩
  • ৬১৬ Time View

রাত পোহালেই ৫ ডিসেম্বর শেরপুরের ঝিনাইগাতী মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এদিনে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে মিত্র বাহিনীর সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধারা ঝিনাইগাতী অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করে।মুক্ত ঝিনাইগাতীতে মুক্তিযোদ্ধার প্রবেশ করে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।

৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষন শুনার পরদিন সকালে নকশী ইপিআর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার হাকিম ঝিনাইগাতী এসে বড় কাপড় ব্যবসায়ী আরফান খলিফাকে সবুজের মাঝে লাল বৃত্তের মধ্যে পুর্ব বাংলার মানচিত্র অংকিত জয় বাংলার একটি পতাকা তৈরীর অর্ডার দেন। সারাদিন চেষ্টা করে আরফান খলিফা ওই পতাকা তৈরী করেন।

পরে ওই পতাকা তিনি নকশী ইপিআর ক্যাম্পে সুবেদার হাকিম সাহেবের কাছে পৌছে দেন। জয় বাংলার পতাকা তৈরীর সংবাদ শুনে আরফান খলিফার দোকানে স্বাধীনতাকামী ছাত্র-জনতার পতাকা তৈরীর হিড়িক পড়ে যায়। আরফান খলিফার তৈরী পতাকা আওয়ামী লীগ অফিস ও স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদ অফিসে শোভা পায়। এ অঞ্চলে আরফান খলিফা সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলার মানচিত্র খচিত পতাকা তৈরীর প্রথম কারিগর হিসেবে ‘৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষ অবদানের খ্যাতি অর্জন করেছেন।

পাক হানাদার বাহিনী ৭১ এর ২৫ মার্চ রাতে যখন ঢাকার বুকে ঘুমন্ত মানুষের উপর হত্যাযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওই রাতেই ৩.৪৫ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া স্বাধীনতার ঘোষণার টেলিগ্রাম ম্যাসেজ ঝিনাইগাতীস্থ ভিএইচএফ ওয়ারলেস অফিসে এসে পৌঁছায়। কর্তব্যরত ওয়ারলেস মাস্টার জামান সাহেব বঙ্গবন্ধুর টেলিগ্রাম ম্যাসেজটি হাতে পেয়ে ভোরে অফিসের পিয়ন পাঠিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ীতে সংবাদ দেন। খবর পেয়ে ভোরেই অর্থাৎ ২৬ মার্চ সকালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হারুন অর রশিদ মাস্টার, শাজল মেম্বার,শরীফ সরকার,সৈয়দ আলী মেম্বার, কাফি মিয়া,সেকান্দর আলী, ছাত্র নেতা আব্দুল মান্নান ও লেখকসহ অনেকেই ওয়ারলেস অফিসে এসে পৌছান।ইংরেজিতে লেখা প্রেরিত টেলিগ্রাম ম্যাসেজটি হাতে পেয়েই স্থানীয় নেতৃবৃন্দ তৎক্ষনাৎ তা শেরপুর সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দের কাছে পৌঁছে দেন।

ইংরেজিতে লেখা ম্যাসেজটি হাতে পেয়েই শেরপুর সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ শহরের জিকে পাইলট স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক নারায়ন স্যারের শরণাপন্ন হয়ে তা বাংলায় অনুবাদ করে নেন। রাতে ঢাকায় গুলি করে পাক সৈন্যরা অসংখ্য বাংগালী হত্যা করেছে।

২৬ মার্চ সকাল থেকেই বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো মানুষ চতুর্দিক থেকে শেরপুর শহরে সমবেত হতে থাকে ঢাকার অবস্থা কি তার সর্বশেষ সংবাদ জানতে। শহরের কাকলী মার্কেটে অবস্থিত সংগ্রাম পরিষদের অফিসে মাইক টানিয়ে সকাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষন প্রচার করা হচ্ছিল। ওই মাইকে ঝিনাইগাতী থেকে প্রাপ্ত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি বাংলায় প্রচার করা হলে শহরের নিউ মার্কেট এলাকায় সমবেত জনতা মূহুর্মূহু শ্লোগানে মূখরিত করে তোলে শহরের আকাশ বাতাস।পরদিন ২৭ মার্চ সকালে শেরপুর সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ সর্বজনাব মহসিন আলী মাস্টার,এডভোকেট আঃ হালিম এমপিএ ও ছাত্র নেতা ভিপি আমজাদ হোসেন ঝিনাইগাতী এসে পৌছান।স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ তাঁদের অভ্যর্থনা জানান।

আলোচনা শেষে সেকান্দর আলী ও ছাত্র নেতা জিএস আঃ মান্নানকে সাথে নিয়ে নেতৃবৃন্দ নকশী ইপিআর ক্যাম্পে যান।নকশী ক্যাম্পের সুবেদার হাকিম নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠকে বসেই বিদ্রোহ ঘোষনা করেন।দেশকে শত্রমুক্ত করাসহ পাক হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য সকল পরিকল্পনা গ্রহন করা হয় ওই বৈঠকে।ওইদিন রাত সাড়ে ৮ টায় সুবেদার হাকিম একটি হ্যারিক্যান জ্বালিয়ে ৪ জন নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে তাওয়াকোচা ইপিআর ক্যাম্প থেকে সীমান্ত পার হয়ে ভারতের পুরাকাসিয়া বিএসএফ ক্যাম্পে পৌছেন।

সেখানে বিএসএফ ক্যাপ্টেন কুমারের সাথে বৈঠক হয়। বৈঠকে ক্যাপ্টেন কুমার যুদ্ধে অস্ত্র সরবরসহসহ সবদিক সাহায্য সহযোগিতার আশ্বাস দেন। শুরু হলো প্রতিরোধ সংগ্রাম। যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ঝিনাইগাতীর রাংটিয়া কুম্ভি পাতার ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শিবির স্থাপন করা হয়। শেরপুর শহর থেকে কর্নেল আরিফ, আক্তারুজ্জামান, মন্জু,ফনু,হিমু,অদুসহ ১২ জন যুবককে নিয়ে অস্ত্র ট্রেনিং শুরু করা হয়।এতে মুজিব বাহিনীর সদস্যরাও অংশ নেয়। অপরদিকে ওই গ্রামের জগৎ মাস্টারের বাড়ীতে টেলিফোন স্টেশন স্থাপন করা হয় যোগাযোগ রক্ষার জন্য। ওই বাড়ী থেকে তার টানিয়ে ভারতের সিসিংপাড়া বিএসএফ ক্যাম্প পর্যন্ত নিয়ে টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা হয়।

সুবেদার হাকিম স্থানীয় ইপিআর, পুলিশ, আনসার, স্বেচ্ছাসেবক (মুজিব বাহিনী) নিয়ে পাক সেনাদের প্রতিহত করার জন্য মধুপুরে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পাক বাহিনীর ভারী অস্ত্র ও গুলি বর্ষণে টিকতে না পেরে ১৪ এপ্রিল পিছু হটে প্রতিরোধ বাহিনী দিকপাইতে পিছু হটে আসে।অতপরঃ পিছু হটে জামালপুর ব্রহ্মপুত্র নদের চরে ব্যাংকার তৈরি করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

কিন্তু পাক বাহিনীর প্রচন্ড চাপের মূখে ২৫ এপ্রিল প্রতিরোধ বাহিনী ভারতে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ২৬ এপ্রিল বিকেলে সুবেদার হাকিমের খোলা জীপ এসে দাঁড়ায় ঝিনাইগাতী পাঁচ রাস্তার মোড় আমতলায়।জীপ থেকে নেমে সুবেদার হাকিম সমবেত জনতাকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে অনুরোধ করেন।এসময় সুবেদার হাকিমের চোখের জল ছলছল করছে লক্ষ্য করলেন লেখক। কারন পাক হানাদার বাহিনীর ভারী অস্ত্রের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করতে না পেরে ব্রহ্মপুত্রের বেরিকেড ভেঙে প্রতিরোধ বাহিনী এদিন সন্ধ্যায় ভারতে চলে যায়। ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত ঝিনাইগাতী শত্রুমুক্ত ছিল।৪ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি কামালপুর দুর্গের পতন হওয়ার সংবাদ পেয়ে এঅঞ্চলের পাকি ক্যাম্পের সৈন্যদের মনোবল ভেঙে পড়ে।যে কামালপুরে মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস ধরে প্রায় প্রতিদিনই রক্তরঞ্জিত হচ্ছিল, সেই কামালপুর দূর্গের পতন হওয়ার সাথে সাথে পাক বাহিনী মেঘালয় সীমান্তের সব এলাকাতে মনোবল হারিয়ে ফেলে এবং দ্রুত পশ্চাৎপসারণ করে।কামালপুরে পরাজিত হয়ে পাকস্তানী সৈন্যরা পিছু হটতে থাকে।

৪ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে পাক বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার,আল বদরদের নিয়ে নকশী,শালচুড়া আহাম্মদ নগর ক্যাম্প গুটিয়ে মোল্ল্যাপাড়া ক্যাম্পের সৈন্যদের সাথে নিয়ে পিছু হটে ওই রাতেই শেরপুর শহরে আশ্রয় নেয়।এভাবে বিনা যুদ্ধে ঝিনাইগাতী শত্রুমুক্ত হয়। ৫ ডিসেম্বর রোববার সকালে বীর মুক্তিযোদ্ধারা মুক্ত ঝিনাইগাতীতে প্রবেশ করে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ায়।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Advertise

Ads

Address

প্রধান কার্যালয় :৩৭৯/৩ কলেজ রোড (আমতলা) আশকোনা ঢাকা - ১২৩০ Email:somajeralonews24@gmail.com Contact  :01823634261 Office:01924751182(WhatsApp) Video editor :01749481920
© All rights reserved 2023

Somajer Alo24